Sunday, 8 November 2026 · 28 Jumada I 1448 AH

সকালের সংবাদ

The Maldives, every morning at 7

The stories that matter in politics, business, tourism and the atolls, written by our own newsroom. Free, one email a day, unsubscribe any time.

বিশ্ব

সৌদি আরব ও হুথি: ইয়েমেনের পাহাড়ি বিদ্রোহ যেভাবে রিয়াদের ওপর যুদ্ধে রূপ নিল

চলতি মাসে রিয়াদ বিমানবন্দরে হুথি হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন, যা এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সৌদি ভূখণ্ডে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। এর পেছনের বিরোধের সূত্রপাত প্রায় তিন দশক আগে, উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে।

The Old City of Sanaa. The Yemeni capital has been under Houthi control since 2014.
The Old City of Sanaa. The Yemeni capital has been under Houthi control since 2014.
গত ১০ অক্টোবর রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে চালানো হামলায় অন্তত ১২ জন নিহত ও প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। এটিকে এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে দেশটিতে সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। সৌদি আরব এ জন্য ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে দায়ী করেছে। জেনারেল অথরিটি অব সিভিল এভিয়েশন জানায়, নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি, দুজন বাংলাদেশি এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। এক সপ্তাহের মধ্যে একই বিমানবন্দরে এটি ছিল তৃতীয় হামলা। ইয়েমেনের ভেতরে হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের বিমান অভিযান জোরদার হওয়ার সময়েই এ ঘটনা ঘটে। দুই প্রতিবেশী কীভাবে এই পর্যায়ে পৌঁছাল, তা বুঝতে হলে প্রায় ত্রিশ বছর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। হুথিরা, যারা নিজেদের আনসার আল্লাহ বলে পরিচয় দেয়, নব্বইয়ের দশকের শুরুতে উত্তর ইয়েমেনের পার্বত্য সাদা অঞ্চলের জায়েদি শিয়া মুসলিমদের মধ্যে গড়ে ওঠা একটি ধর্মীয় পুনরুজ্জীবন আন্দোলন থেকে উদ্ভূত। জায়েদিরা শিয়া ইসলামের একটি স্বতন্ত্র শাখা, এবং তাঁদের ইমামরা ১৯৬০-এর দশক পর্যন্ত প্রায় এক হাজার বছর উত্তর ইয়েমেনের বড় অংশ শাসন করেছেন। আন্দোলনটির নাম এসেছে এর নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকে। ২০০৪ সালে সাদায় সরকারি বাহিনীর হাতে হুসেইন আল-হুথি নিহত হন, আর তা থেকেই বিদ্রোহের সূচনা। ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুথি ও ইয়েমেন সরকারের মধ্যে ছয় দফা লড়াই হয়, যার কোনো সুস্পষ্ট ফল আসেনি। নেতৃত্ব যায় তাঁর ভাই আবদুল মালিক আল-হুথির হাতে, যিনি এখনো আন্দোলনের প্রধান। ২০০৯ সালে সৌদি আরব এই গোষ্ঠীর সঙ্গে সীমান্ত সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে। ২০১১ সালের গণ-অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতাচ্যুত হন, আর তার পরের রাজনৈতিক অন্তর্বর্তী প্রক্রিয়া স্থিতি পায়নি। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হুথিরা রাজধানী সানা দখল করে। ২০১৫ সালের শুরুতে তারা দক্ষিণে অগ্রসর হলে প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বু মনসুর হাদি দেশ ছেড়ে পালান। ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরবের নেতৃত্বে আরব দেশগুলোর একটি জোট হাদির সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিমান অভিযান শুরু করে। যেটি স্বল্পমেয়াদি অভিযান হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তা বছরের পর বছর ধরে চলা যুদ্ধে পরিণত হয়। মানবিক মূল্য ছিল ভয়াবহ। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) ২০২১ সালের নভেম্বরে পূর্বাভাস দেয়, ওই বছরের শেষ নাগাদ এই সংঘাতে ৩ লাখ ৭৭ হাজার মানুষের মৃত্যু হবে। এটি প্রকৃত গণনা নয়, বরং একটি হিসাবি নকশার ভিত্তিতে করা প্রক্ষেপণ। ইউএনডিপির অনুমান, এর প্রায় ৬০ শতাংশ মৃত্যু সরাসরি লড়াইয়ে নয়, বরং ক্ষুধা ও প্রতিরোধযোগ্য রোগের মতো পরোক্ষ কারণে। যুদ্ধ সৌদি ভূখণ্ডেও পৌঁছায়। বছরের পর বছর হুথিরা সৌদি শহর, বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনায় ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার অনেকগুলো দেশটির আকাশ প্রতিরক্ষা প্রতিহত করেছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতির পর বড় পরিসরের লড়াই অনেকটাই থেমে যায়। ২০২৩ সালের মার্চে পরিস্থিতি আরও শান্ত হয়, যখন চীনের মধ্যস্থতায় সৌদি আরব ও ইরান কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে সম্মত হয়। রিয়াদ ও পশ্চিমা সরকারগুলোর ভাষ্য, ইরানই হুথিদের অস্ত্র জোগায়। সৌদি কর্মকর্তারা হুথিদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনাও করেন। সেই স্থিতি এ বছর ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ে হুথিরা সৌদি জাহাজ চলাচলে অবরোধ ঘোষণা করে। সৌদি অনুমতি ছাড়া একটি ইরানি উড়োজাহাজ সানায় অবতরণের চেষ্টা করার পর সানা বিমানবন্দরে হামলা ও হুথিদের পাল্টা জবাবের মধ্য দিয়ে লড়াই আবার শুরু হয়। এর পেছনে বড় ভূমিকা ছিল নৌপথের: হরমুজ প্রণালিতে ইরানি বিধিনিষেধের কারণে সৌদি আরব লোহিত সাগরের পথে অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল, আর হুথিরা পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল। সেপ্টেম্বরজুড়ে লড়াই তীব্র হয়। ৩ সেপ্টেম্বর হুথিরা সরকারি বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে, আর ৮ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের খামিস মুশাইত, আবহা, জিজান ও নাজরান শহরে হামলা চালায়, যাতে ৭৩ জন আহত হন বলে জোটের মুখপাত্র জানান। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানায়, ২৩ আগস্ট থেকে ইয়েমেনে অন্তত ৭২৮ জন নিহত বা আহত হয়েছেন, যাঁদের বেশির ভাগই তাইজ ও পশ্চিম উপকূল এলাকার। দুই পক্ষের দেওয়া হতাহতের হিসাব স্বাধীনভাবে যাচাই করা কঠিন। সৌদি আরব বলেছে, চলতি মাসে এক দিনেই তারা ১ হাজার ৮৭৯টি হামলা চালিয়ে প্রায় ৯৫০ যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। অন্যদিকে হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলেছে, ৩ সেপ্টেম্বর থেকে ১৩টি প্রদেশে সৌদি হামলায় ১০৭ জন নিহত হয়েছেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বিমানবন্দরে হামলার নিন্দা জানিয়েছেন, আর ইয়েমেনবিষয়ক জাতিসংঘ দূত হ্যান্স গ্রুন্ডবার্গ একে গুরুতর উত্তেজনা বৃদ্ধি বলে বর্ণনা করেছেন। কাতার, পাকিস্তান, মিসর, জর্ডানসহ অন্যান্য দেশও নিন্দা জানিয়েছে, আর ওমান সংযমের আহ্বান জানিয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযানে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ওয়াশিংটন বিবেচনা করছে; হুথিরা সে ক্ষেত্রে জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে।